মাত্র পাওয়া

ইতিহাস-মিথের সন্ন্যাসী রাজা ও ভাওয়াল রাজবাড়ি ( দ্বিতীয় কিস্তি)

শাহান সাহাবুদ্দিন | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ৫:৪৫ অপরাহ্ণ

ইতিহাস-মিথের সন্ন্যাসী রাজা ও ভাওয়াল রাজবাড়ি ( দ্বিতীয় কিস্তি)

[ভাওয়াল রাজা তথা সন্ন্যাসী রাজা ইতিহাসের এক আশ্চর্য চরিত্র। রাজার ভালোবাসা ও সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে রাণী বিভাবতী পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন তাঁদেরই রাজকর্মচারী ডা. আশুতোষের সঙ্গে। একপর্যায়ে নেপথ্যে দুষ্টগ্রহের পোশাক পরিধান করেন রাণীর ভাই সত্যেন মূখার্জি। রাণী বিভাবতী, ডা. আশুতোষ ও সত্যেন মূখার্জি- এ ত্রি চরিত্র মিলে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। রাজাকে হত্যা করতে চাইলেন। ঘটতে থাকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা… ইতিহাস খুঁড়ে সেসবরেই মর্মন্তুদ আখ্যান দক্ষ হাতে তুলে আনলেন কবি, গল্পকার ও দৈনিক বিরাজমান এর নির্বাহী সম্পাদক শাহান সাহাবুদ্দিন। আজ ছাপা হলো দ্বিতীয় কিস্তি। ]

এইটুকু করেই তিনি ক্ষান্ত হলেন না, হাতির পিঠে সওয়ার করিয়ে খাস জমিদারের মতোই জয়দেবপুরে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ করে দেন। জয়দেবপুরে এসে রমেন্দ্র নারায়ণ রায় যখন প্রাসাদে আতিথিয়তা নিয়ে খাচ্ছিলেন তখন সন্ন্যাসীকে তর্জুনি উঠিয়ে খেতে দেখে ভুলুর কাকা বললেন,‘এ মেজ কুমার’। চারদিকে তখন প্রজা ও দর্শনার্থীদের মাঝে হৈ চৈ পড়ে গেছে। বিকেলের দিকে মেজকুমারকে যখন তাঁর বোন জ্যোতির্ময়ীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো সেখানে ঠাকুরমা সত্যভামা দেবীসহ ছোট বোন, ভাগ্নী ও বড় বোনকে দেখে আবেগ্লাপুত হয়ে পড়েন তিনি, তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়াতে থাকে, দীর্ঘ পঁচিশ বছরের যাপিত দিনের স্মৃতি এক এক করে তাঁর চোখের সামনে ছায়াছবির মতো ভাসতে থাকে, বুকের ভেতরের আবেগি নদীতে উঠে ঢেউ, শুরু হয় প্লাবন; এক পর্যায়ে সন্ন্যাসী ছোট কুমার রবীন্দ্র নারায়ণ রায়ের ছবি দেখে উচ্চস্বরে কাঁদতে শুরু করলে বোন জ্যোতির্ময়ী দেবীসহ হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে স্পষ্ট স্বরে সন্ন্যাসী জনতার চাপে নিজের পরিচয় তুলে ধরেন এইভাবে-‘ আমি মেজ কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী’। উত্তর শুনে উপস্থিত জনতা ‘জয় মেজ কুমারের জয়’ শ্লোগানে ও উলু ধ্বণিতে রাজবাড়ি কাঁপিয়ে তুললো। এ নাটকীয় ঘটনার সূত্র ধরে রাণী বিভাবতী ও কোর্ট অব ওয়ার্ডস কর্তৃক উপেক্ষিত হয়ে সন্ন্যাাসী নিজেকে মেজকুমার হিসেবে প্রমাণ করতে এবং হারানো জমিদারী ফিরে পেতে দীর্ঘ একুশ বছর পর ১৯৩০ সালে মামলা ঠুকলেন আদালতে। বৃটিশ পিরিয়ডের বহুল আলোচিত এ মামলার শুনানী শুরু হয় ১৯৩৩ সালের ২৭ নভেম্বর। বাদীর পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন ব্যারিস্টার বি সি চ্যাটার্জি, অন্যদিকে বিবাদী মেজ রাণীর পক্ষ হয়ে মামলায় লড়েন ব্যারিস্টার এ. এন. চৌধুরী। এছাড়া ঢাকা ও কলকাতা বারের শতাধিক আইনজীবী উক্ত মামলায় সংশ্লিষ্ট ছিলেন। আদালতে মোট ১০৬৯ জনের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ২৭ জনের কমিশন পাঠিয়ে স্বাক্ষ্য নেয়া হয়। বিলেতেও কমিশন পাঠানো হয়। সাক্ষীদের মধ্যে ৯৬৭ জনই বলেছিলেন বাদীই ভাওয়ালের মেজ কুমার । অন্যদিকে বিবাদী পক্ষের ৪৭৯ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৩৪ জন চাকুরী হারানো ও জীবন নাশের হুমকীতে বাদীর বিপক্ষে স্বাক্ষ্য দেন। আদালতে সন্ন্যাসী মেজ কুমার বলেন,‘ আমি রাজেন্দ্র নারায়ণের পুত্র কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায়। আমার ঠাকুর দাদার নাম রাজা কালি নারায়ণ রায়, ঠাকুমা সত্যভামা দেবী, মা রাণী বিলাস মণি দেবী। বাংলা ১৩০৯ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসে ১৮/১৯ বছর বয়সে তেরো বছর বয়সের বিভাবতীর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়।’
‘ছেলে বেলায় আমি পশু পাখি নিয়ে সময় কাটিয়েছি। একটা খাসির গাড়ি ছিল
আমার, গাড়িতে খাসি জুড়ে দিয়ে আমি নিজে চালাতুম। লেখাপড়ায় বিশেষ মন ছিলনা আমার।’
‘আমার পিতার মৃত্যুর পর জয়দেবপুরের রাজবাড়িতে আমিই চিড়িয়াখানা করেছিলুম। চিড়িয়াখানায় ছিল চারটে বাঘ, ছোট বড় চারটে বন-মানুষ, এক জোড়া সম্বর হরিণ,ছোট হরিণ এক জোড়া, কৃষ্ণ সার হরিন একজোড়া, একটা উট, একটা গাধা, পুকুরে একটা কুমির,একজোড়া শালিকপাখি, একটা গাধা, ১৫/১৬টা ময়ূর, একজোড়া রাজ হাঁস, একজোড়া উট পাখি, একজোড়া তিতির পাখি, ধনেশ পাখি, ক্যানরি পাখি ও একটি শেয়াল, ১৪/১৫ টা হাতি, ৪০/৫০ টা ঘোড়া । তাছাড়াও ব্রুহাম, টমটম,রুপোর গাড়ি ছিল। আমি হাতি ও ঘোড়ায় চড়তে পারতুম, গাড়ি চালাতে পারতুম। সহিস, কোচম্যান ইত্যাদি শ্রেণির লোকের সঙ্গে শিকারে যেতুম। বাঘ, ভাল্লুক, হরিণ শিকার করেছি। জয়দেবপুরের পোলাগ্রাউন্ডে ছোট ভাই ও মণিপুরী লোকদের সঙ্গে আমি পোলো খেলেছি। শিকার থেকে সন্ধ্যায় ফিরতে পারলে বাড়ি ফিরেই তাস পাশা খেলতুম। আমার শরীর অনুযায়ী আমার পা ছোট। আমার মা, ছোট ভাই রবীন্দ্র ও ভাগ্নে বুদ্ধুর পা ছোট ছিল। বুদ্ধু ভাদ্র মাসে মারা গেছেন। বাবার মৃত্যুর পর আমরা বড়দিনে কলকাতা যেতুম।’

আদালতে মেজ কুমারের দেয়া জবানবন্দির সঙ্গে হুবহু বাস্তবতা মিলে গেল। এছাড়াও মেজ কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় ও বাদী যে একই ব্যক্তি তা প্রমাণের জন্য ১৯০৫ সালে বাদী কর্তৃক করে রাখা ইন্সুরেন্সের ছবি, রোগ ব্যাধি সংক্রান্ত তথ্য, শরীরে বিভিন্ন স্থানে দূর্ঘটনা ও জন্ম জনিত চিহ্ণ ইত্যাদি মিলিয়ে দেখা হলো। বিখ্যাত শিল্পী ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কিউরেকটর পার্সি ব্রাইন ও যামিনী গাঙ্গুলী মেজ কুমার ও বাদির ছবি পরীক্ষা করে জানালেন দুজন আসলে একই ব্যক্তি। ১৯০৪ সালে কুমারের পায়ের ওপর দিয়ে ফটন গাড়ি গেলে সেখানে দাগের চিহ্ণ থেকে যায়, যা বাদীর পায়েও পরিলক্ষিত হয়। তিনজন বিখ্যাত চিকিৎসকের টিম বাদীর শরীর পরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে আসেন যে ১৯০৫ সালে কুমারের উপদংশের অস্তিত্ব এই ব্যক্তি বহন করে চলেছেন।
১৯৩৬ সালের ২৪ আগস্ট তৎকালীন স্বনামধন্য বিচারক পান্না লাল বসু উভয় পক্ষের ১৫৪৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে জনাকীর্ণ আদালতে ঐতিহাসিক রায়ে বলেন-‘ইনিই হচ্ছেন ভাওয়ালের পরলোকগত রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায়ের মেজ পুত্র নিরুদ্দিষ্ট কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায়’।
রায় শুনে কুমার তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন,‘ভগবানের দয়ায় ও জনসাধারণের সহানুভুতিতে এই জয় হয়েছে।’ আনন্দে উদ্বেলিত জয়দেবপুরবাসী সেদিন শোভাযাত্রা বের করে। বলা বাহুল্য, এই রায় সর্বস্তরের মানুষ মেনে নিলেও মেজ রাণীর ভাই সত্যেন্দ্র ও মেজরাণী এ ঐতিহাসিক রায় মেনে নেননি। ফলে এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে বিভাবতী ১৯৪০ সালের ২৫ মে কলকাতা হাই কোর্টে আপিল করে পরাজিত হন। পরে পুনরায় ১৯৪৬ সালের ৩০ জুলাই বিলেতের প্রিভি কাউন্সিলে আপিল করে সেখানেও মেজ রাণী পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করেন। শেষ পর্যন্ত মেজ কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় ভাওয়াল স্টেটের এক-তৃতীয়াংশ ফিরে পান। সেদিন সমবেত জনতা ‘ভাওয়াল কুমার কি জয়’ হর্ষ ধ্বণিতে জয়দেবপুরের আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তুলে। ভাওয়াল পরগণার সর্বত্র মিষ্টি বিতরণ করা হয়, আনন্দ মিছিল বের করে সর্ব সাধারণ প্রজারা। জানা যায় আপিলের রায় বেরোনোর দুদিন পর আশ্চর্য রহস্যময় সন্ন্যাস রাজা মৃত্যু মুখে পতিত হন।

রাণী বিভাবতীর সাক্ষাতকার
সে সময়ের বিখ্যাত বাঙালি লেখিকা রশিদ আলি বেগ চূড়ান্ত রায় বেরোনোর পর কলকাতার ল্যান্স ডাউন রোডের বাড়িতে মেজ রাণী বিভাবতীর সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিন পর একজন উঁচুদরের সহানুভূতিশীল লেখিকা পেয়ে বিভাবতী সেদিন প্রাণ খুলে কথা বলেছেন। সাক্ষাতকারে রাণীর প্রতিক্রিয়ায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে, যা ঐতিহাসিক বাস্তবতার বিচারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সে সাক্ষাতকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।
মিসেস আলীঃ মনে করুন আপনি পুনরায় সেই জয়দেবপুরে ফিরে গেছেন, এক্ষেত্রে তখন যা করেছিলেন তাই কি করবেন?
রাণী বিভাবতীঃ কখনোই না, আমি আমার উকিল-ব্যারিস্টারদের কথা আর শুনছিনা, তারা আমাদের কলে ফেলে ঠকায়। আমি সোজা আদালতে গিয়ে সেই সন্ন্যাসীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলবো,‘তুমি আমার স্বামী নও’।
মিসেস আলীঃ তাহলে সে কী সত্যিই আপনার স্বামী নয়?
রাণী বিভাবতীঃ কি বলছো এসব তুমি মা? লোকটা কখনোই আমার স্বামী নয়। লোকটার কান দেখলেই তুমি বুঝতে পারতে আমার স্বামীর কান ওরকম ছিলনা।
মিসেস আলীঃ আপনি কি সন্ন্যাসীকে কাছ থেকে দেখেছিলেন?
রাণী বিভাবতীঃ এই যে এই বারান্দার কাছে একটা গাছ ছিল; আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলুম, গাড়িটা এখানে থামলো, গাড়িতে ছিল জ্যোতির্ময়ের ছেলে আর সেই সন্ন্যাসী; সে লোকটি আমাকে দেখতে থাকলো, আমিও তাকে লক্ষ্য করলুম, কিন্তু সে আমার স্বামী নয়, এই লোকটাতো বেশ মোটা, তাছাড়া কান-ওহ্,এ অসম্ভব!
মিসেস আলীঃ সেই একবারই দেখলেন? আর দেখেননি?
রাণী বিভাবতীঃ সেদিন বেড়াতে গিয়েছি ল্যান্ডো গাড়িতে, গাড়িতে বসে আছি , গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল তখন; খুব কাছেই এসে একটা ট্যাক্সি থামলো, সে লোকটি ট্যাক্সিতে বসা; না, সে আমার স্বামী নয়, দার্জিলিংয়ে আমার স্বামী মারা গেছেন, ঘন্টার পর ঘন্টা আমার মৃত স্বামীর মাথা আমার কোলের ওপরে ছিল; আমার চেয়ে বেশি আর কে জানবে? মাঝরাতে তিনি মারা গেলেন, সকালে তাঁকে আমার কোল থেকে ওরা নিয়ে গেল, আমি তখন কেঁদেই চলেছি।…লোকটা জোচ্চোর, প্রতারক, সে কখনোই মেজ কুমার নয়।
মিসেস আলীঃ কিন্তু আপনার হার হলো। আদালত, এমনকি বিলেতের প্রিভি কাউন্সিল পর্যন্ত সন্ন্যাসীকেই মেজ কুমার বললো।
রাণী বিভাবতীঃ শেষ বিচার বলেতো কিছু আছে। আমি তখন সদ্য স্নান শেষে বাথরুম থেকে বেরিয়েছি, মাথার চুল তখনো ভিজে, সেই সময়ে প্রিভি কাউন্সিলের রায় জানতে পারলুম। এতো অবিচার? বুকে তীব্র দহন অনুভূত হলো, কিছু বুঝে ওঠতে না পেরে ঠাকুর ঘরে ঢুকলুম, প্রদীপ জ্বালালুম; দেয়ালে টানানো কৃষ্ণের ছবির দিকে তাকিয়ে মনে মনে প্রার্থনা করলুম; মনে হলো কৃষ্ণ হাসলেন। হঠাৎ কানে একটা গোলমাল এলো, কারা যেন বলছে সেই সন্ন্যাসী লোকটা প্রিভি কাউন্সিরের রায় বেরোনোর দুদিন পর ঠনঠনিয়ার কালি মন্দিরে ঠাকুরকে প্রণাম করতে গিয়ে মুখে রক্ত ওঠে লোকটা মানে সেই সন্ন্যাসীর মরণ হলো।
সাক্ষাতকার পর্ব শেষ হলে মিসেস আলী বেগকে রাণী বিভাবতী বললেন,‘আমার কথাই লিখো, দেখো ভুল করোনা, আমার কথাই লিখো।’
মিসেস বেগ বিভাবতীর কথা রেখেছিলেন। কিংবদন্তীর সন্ন্যাস রাজা রমেন্দ্র নারায়ণ রায় ও মেজ রাণী বিভাবতীর আখ্যান নিয়ে লিখেছেন ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘দি মুন ইন রাহু, অ্যান অ্যাকাউন্ট অব দি ভাওয়াল কেস’।   চলবে…

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

div1 div2 div3 div4 div5 div6 div7 div8