মাত্র পাওয়া

শেখ শওকত আলী মাস্টার: চিরকালের আলোকশিখা

| ০১ নভেম্বর ২০২০ | ৪:৫৭ অপরাহ্ণ

শেখ শওকত আলী মাস্টার: চিরকালের আলোকশিখা

  • শাহান সাহাবুদ্দিন

[১৯৯৭ সনের এই দিনে মহান আল্লাহর ইশারায় অসামান্য মানুষটি সাড়া দিয়েছিলেন। দয়াময় তাঁকে জান্নাত দান করুন। আমীন।]

আমার মতো অনেকের কাছেই তিনি চিরকালের আলোকশিখা। কালের ঝাপটা তাঁকে নির্বাপিত করতে পারেনি। তিনি শেখ মো. শওকত আলী মাস্টার। কালের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন,বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি যখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরলেন, ৭১ এর শেষের দিকে, তাঁকে কেউ চিনতে পারেননি। চিনেছিলেন শুধু একজন,তাঁর মা। ঘন দীর্ঘ দাড়িগোঁফ, আউলাচুল, অনেকটা উন্মুল বোহেমিয়ানদের মতো। তাঁর জীবনের বড় বিপ্লবটা তিনি করে এসেছেন, জীবন বাজি রেখে। মা ছাড়া এরকম বেশভূষায় দ্বিতীয় কেউ চিনতে পারার কথাও নয়। তেইশ বছর হ’য়ে গেলো তিনি লোকান্তরিত হয়েছেন। এর মধ্যে কালের যাত্রা ধ্বণি আমাদেরকে কতো বার্তা দিয়ে গেছে।

ইতিহাসের কিছুটা বাঁক বদল, মানুষের জীবন ও দেশের নানামাত্রিক উন্নতি অবনতি, কতো নদীর জল শুঁকিয়ে গেছে, পৃথিবীর ধ্বমনী সংকোচিত হ’য়ে করোনার অভিষেক ঘটলো দুনিয়ায়, মানুষের জীবন ও মানুষগুলোও অন্যরকম হ’য়ে গেলো। শুধু একজন ব্যক্তিত্ব প্রায় দু’ যুগ পৃথিবীতে না থেকেও গাজীপুর সদররের ও নরসিংদীর শিবপুরের অসংখ্য মানুষের হৃদয় জমিনে বিশেষ ভাবে র’য়ে গেলেন, তাঁকে ভোলা গেলো না, কেউ তাঁকে ভুলতে পারলো না। কেন ভুলতে পারলো না? তার নানা কারণ আছে। সবচেয়ে বড় কারণ যেটি তা হলো তাঁর বিপুলা কর্ম মানুষের মানসপটে চিত্রপটের মতো এমনই চিরস্থায়ী হ’য়ে আছে যে, কোন ষড়যন্ত্র, কোন কূটচাল তাঁর মহিমাকে আড়াল করাতে পারেনি। মানুষ কালের নায়কটিকে ঠিকই তাঁদের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গায় ধ’রে রেখেছেন। সঙ্গত কারণে শওকত আলী মাস্টার সাহেবের কীর্তি এতোটুকু ম্লাণ হয়নি। তাঁর কীর্তি জারি আছে অবহেলিতের কাছে, শোষিত-বঞ্চিতের কাছে, খেটে খাওয়া মানুষ ও শুদ্ধচারী মানুষের কাছে। হাজার হাজার ছাত্র ও ইতিহাস সচেতন যুবাদের কাছে।

স্বাধীনতা উত্তরকালে, ৭৫ এর ১৫ আগস্ট এর পর, সেনাশাসক আর নষ্টদের হাতে তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ যখন উদ্ভট উটের পিঠে অথবা রোমের মতো বিপজ্জনক হয়ে ওঠছে, তখন থেকে ৯৬ এর ১২ জুন এর আগ পর্যন্ত আওয়ামীলীগ যখন দূর্বিবাকে, বিপন্ন সময়ে, তখন স্রোতের বিরুদ্ধে ইতিহাসের দায় থেকে জীবন বাজি রেখে যে ক’জন মানুষ কাজ ক’রে গেছেন, সোচ্চার কন্ঠস্বর ছিলেন, শওকত আলী মাস্টার সাহেব ছিলেন তার মধ্যে একজন। দুঃসময়ে ও অন্ধ-নষ্টদের কর্তৃক যখন দেশ পরিচালিত হচ্ছিলো তখন গাজীপুর সদর ( সদর ও টংগী) আওয়ীলীগের হাতে গোনা দু চারজন বাতিঘরের একজন ছিলেন এই সাহসী মানুষটি। ছিলেন সাবেক সাংসদ শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার সাহেবের থিংকট্যাংক। শেখ সাহেবের কাছে যেমন তাজউদ্দীন। ৯৬ এর ১২ জুন, আওয়ীলীগ যখন ক্ষমতায় এলো নানা ঘাত প্রতিঘাত অভিঘাতের ভেতর দিয়ে, তখন শেখ শওকত আলী মাস্টার সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে আমরা অবিকল পাঠ নিচ্ছি- “আমার পায়ের শব্দ শোনো– নতুন এ আর সব হারানো পুরনো” তার দেড় বছর যেতে না যেতেই ৫০ পেরোনোর আগেই নানা অভিমানে নিভৃতে অথচ ধনুকের মতো শিড়দাঁড়া টান টান রেখেই তিনি ইহলোক ছাড়লেন। তাঁর প্রিয় গীতিকবিতা, যা তিনি তাঁর উত্তরসূরী সঙ্গীতা মুক্তা শান্তার হৃদয়ে প্রোথিত করে দিয়েছিলেন, সেই প্রিয় পংক্তি ‘ মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’, সেই ফুল রেখে, হৃৎপিন্ডসম তিনকন্যা, জীবনসঙ্গীনী সালেহা বেগম ও অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী, অনুরাগী, কর্মী, স্বজন রেখে,প্রাণের বাংলাদেশের আকাশ রেখে তিনি চ’লে গেলেন অদৃশ্যের ওপারে। দিনটি ১৯৯৭ সনের,১ নভেম্বর। তারও আগে, ৯৬ এ আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার আগে। ৯১ এর দিকে, এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে যেবার বিএনপি ক্ষমতায় এলো, তিনি যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতেন (ছিলেন বিপুল জনপ্রিয় শিক্ষক)- ভবানীপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সে প্রতিষ্ঠানে সভাপতি হয়ে এলেন স্বাধীনতা বিরোধী শিবিরের একজন। সঙ্গত কারণেই এর প্রতিবাদে আগ্নেয় ভূমিপুত্র শেখ শওকত সাহেব স্কুল থেকে বিদায় নিলেন পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে। আর শিক্ষকতায় ফিরেননি। উজ্জ্বল আলোর দিন নিভে যায়নি তখনো। বৃহত্তর মির্জাপুর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের হাজার হাজার মানুষের অনুরোধে সাড়া দিয়ে তিনি স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হোন। বিপুল সমর্থনে প্রতিনিধিও হোন। তারপর তাঁর মঞ্জিল হয়ে ওঠে বিপন্ন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। তাঁর নিয়তি হয়ে ওঠে খেটে খাওয়া মানুষ, মুটে মজুর কৃষক চামার। তিনি হয়ে ওঠেন তাঁদের কন্ঠস্বর, মুক্তির প্রতিভূ।

তারপর তিন চার বছর পেরোতে না পেরোতে বীণার তারের মতো কর্মযোগী বীরের প্রাণ ছিঁড়ে যেতে চায়, মৃত্যুর শান্তির স্বাদ পেতে চায় ক্ষণজন্মা মানুষটির হৃদয়, পৃথিবীর সব রুপ যখন ঘাসে লেগে আছে তখন আকাশ মাথায় নিয়ে হাঁটা সুদর্শন ৬ ফুটের কাছাকাছি মানুষটি, হাজার হাজার মানুষের হৃদয়ের ধনটি, আমাদের প্রাজ্ঞজন পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ নিয়ে মহান আল্লাহর আহবানে সাড়া দিয়ে তরীতে পা রাখলেন! সম্পর্কে আমার নানা হোন তিনি (আত্মা ও চেতনার সম্পর্কে)। অথচ আমার কাছে তিনি সক্রেটিশ, গৌতম বুদ্ধ ও ওমর ফারুক (রা.) এর দর্শনের প্রতিভূ, যেন তিনি বিনয়ের সঙ্গে কানে কানে আমাকে ফিসফিস ক’রে প্রবল দৃঢ়তা নিয়ে ব’লে যান: “কেহ যাহা জানে নাই, কোন এক বাণী আমি বয়ে আনি; আমি তাই আসিয়াছি, আমার মতন আর কেউ নাই!” আজও যখন ভবানীপুর বাজার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে চলে যাওয়া রাস্তা (যা তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। তাও ষড়যন্ত্রকারীরা বারবার চেয়েছে এই স্মৃতিচিহ্ন মুছে দিতে। এখনো চেষ্টা ক’রে যাচ্ছে।) ধ’রে হাঁটি, শেখ শওকত সাহেব কাঁচের দেয়াল ভেঙে যাবার আগে, দীপ নিভে যাবার আগে, পাতা ঝরার আগেই সান্ত্বনা দেবার ছলে আমার উদ্দেশে যেন বলতে থাকেন- “Let us go than you and I when the evening is spread out against the sky Like a patient etherised upon a table.” মহান এই যোদ্ধাকে, কালের বিবেককে দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা শান্তিতে রাখুন। আমিন।

লেখক: শাহান সাহাবুদ্দিনঃ কবি,গল্পকার ও সাংবাদিক

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

পথেই যাদের জীবন।

০৬ অক্টোবর ২০২০