মাত্র পাওয়া

করোনাময় পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা

| ১৩ এপ্রিল ২০২০ | ১০:২৩ অপরাহ্ণ

করোনাময় পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা

পয়লা বৈশাখ বা পহেলা বৈশাখ বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ, বঙ্গাব্দের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি সকল বাঙালী জাতির ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের দিন। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নিয়ে থাকে। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন লোকউৎসব হিসাবে বিবেচিত। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে বাংলাদেশের প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমী কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে চান্দ্রসৌর বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে ১৫ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। এছাড়াও দিনটি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ছুটির দিন হিসেবে গৃহীত। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা দিনটি নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ হিসেবে বরণ করে নেয়। এই উৎসবে থাকেন শোভাযাত্রা, মেলা, পান্তাভাত খাওয়া, হালখাতা খোলা গ্রামে বসে মেলা ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয়। বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছা বাক্য হল “শুভ নববর্ষ”।

নববর্ষের সময় বাংলাদেশে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ২০১৬ সালে, ইউনেস্কো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত এই উৎসব শোভাযাত্রাকে (মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য) হিসেবে ঘোষণা করে। মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। এর পিছনে হয়তো একটা কারণ লোকায়ত ছিলো সেটা হলো আরবি পঞ্জিকা অনুযায়ী খাজনা আদায়ে সমস্যা হতো কারণ আরবি সাল চন্দ্রের নির্ভর করতো।  এমন অবস্থা থেকে তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে রাজকীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় ৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬ থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে “বঙ্গাব্দ ” বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব এর খাতার কথা বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাবের খাতা খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে বাংলার গ্রাম অঞ্চলে । বাংলাদেশ নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় পরে এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং মোটামুটি সুন্দর করে সাজানো হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকায়, কোনো খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুটির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানা রকম পিঠা পুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে নৌকাবাইচ , লাঠি খেলা কিংবা কুস্তি একসময় প্রচলিত ছিল। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি হয় ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে , যা জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত। এছাড়া সোনারগাঁওয়ে বউমেলা যা প্রায় ১০০বছর ধরে চলছে এটা পহেলা বৈশাখ থেকে পাঁচ দিনব্যাপী চলে পাশেই থাকে ঘোড়ামেলা। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে যাদের প্রত্যেকেরই বছরের নতুন দিনে উৎসব আছে। ত্রিপুরাদের বৈসুক , মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিসত্তা একত্রে এই উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসাবি উৎসব। এই উৎসবের নানা দিক রয়েছে, এর মধ্যে একটি হলো মারমাদের পানি উৎসব। এছাড়া গ্রামের মাঝে থাকে নানা আয়োজন নববর্ষকে ঘিরে। গ্রামীন মেলা যে খানে থাকে বাঙ্গালীর ঐতিহ্য বাহি অনুষ্ঠান যাকি না বাঙ্গালীর ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং কৃষ্টি ও শিল্পকলাকে প্রকাশ করে। শিশুদের জন্য থাকে নাগরদোলা, পুতুল নাচ,সার্কাস ইত্যাদি। প্রদর্শন এর জন্য থাকে হাতের শিল্প,মাটির শিল্প কিংবা কুটির তৈরী নানা শিল্প । যা কিনা ক্রয় বিক্রয় হয়। নববর্ষ মানুষের মনে আরো একটি বার্তা নিয়ে আসে,তা হলো পুরাতন কে ভুলে নতুন কে বরণ করতে শেখায়। সকল মানুষকে নতুন রুপে সাজতে শিখায়। বাঙ্গালী যে বরাবরই আমোদ প্রিয় তা অনুষ্ঠান দেখলে বুঝাই যায়। তাই নববর্ষকে আরো সাজিয়ে তোলে বাঙ্গালির সাজে লাল কিংবা সাদা সবাই সাজে বাহারি রং এর কাপড়ে শিশু কিংবা বুড়ো বাদ যায়না কেউই।

এই পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ যাই বলি না কেন দিনটির জন্য অপেক্ষা করে থাকে হাজারো প্রেমিক প্রেমিকা তাদের ভালবাসাকে নতুন ভাবে সাজাতে, হাতে হাত রেখে ঘুরতে যায় মেলাই অনেকে পার্কে কেউ যায় লেকের ধারে তবে ঘুরতে হবে এটা যেন সবার আবদার। বাহারি সাজে শাড়ি কিংবা দূতি পড়ে। এটাই যেন চলছে আধুনিক কাল ধরে। তবে এই বার প্রকৃতি যেন তার মুখটা ফিরিয়ে নিয়েছে তাই শুধু আমাদের দেশে না সারা বিশ্বজুড়ে আজ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে করোনা ভাইরাস। তাই নববর্ষ এইবার আর ঘটা করে না । শুধু মাত্র অনুষ্ঠানিকতা। তাতে কি! যুগটা তো আধুনিক ঘরে বসেই ছড়াই না নববর্ষের শুভেচ্ছা। ভাগ করে নিই আনন্দ। বাসায় থাকি নিরাপদে থাকি,অন্যকে নিরাপদে রাখি ৷

আসেন সকলে মিলে আবার সেই রঙ্গিন চিঠি লিখে শুভেচ্ছা জানায় প্রিয়জনদের। শুধু একটু আধুনিক করে মোবাইল বার্তা দিয়ে। আমার শুভেচ্ছা রইল বিশ্বের সকল বাঙ্গালি ও খুব কাছের আপনজনদের জন্য-শুভ নববর্ষ।

 

লেখকঃ ইমরান হাসান

শ্রীপুর, গাজীপুর। 

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

div1 div2 div3 div4 div5 div6 div7 div8