মাত্র পাওয়া

করোনার সুফল!

| ১৩ এপ্রিল ২০২০ | ৭:৪৬ অপরাহ্ণ

করোনার সুফল!

একদিন আমার এক শিক্ষক বেতের খসখসে লাঠি দিয়ে বেঞ্চের উপর দুইটা বারি দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বল তো, পলাশীর যুদ্ধের সুফল কী? আমি বুকে আত্মবিশ্বাস সঞ্চয় করে বলেছিলাম, কোন সুফল নেই। শুধু কুফল আর কুফল। ভেবেছিলাম তিনি খুশি হয়ে প্রশংসা করবেন। কিন্তু আমার ধারণা তিনি ভুল প্রমাণ করেন। তার হাতে থাকা বেতের লাঠি দিয়ে আবার বারি দিলেন, তবে এবার বেঞ্চের উপর না দিয়ে দিলেন আমার পিঠের উপর। আমি স্যারকে মনে মনে রাজাকার বলে গালি দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এদেশের খেয়ে পরে ইংরেজদের সুনাম করে। মনে মনে সংকল্প করেছিলাম যে স্যারের কোন বংশধরকে একবার হাতের কাছে পেলে এর শোধ নিব। প্রত্যেক খারাপ জিনিসেরই ছোটখাটো হলেও কোন না কোন ভালো দিক থাকে তা বুঝতে আমার আরো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। পানি আর ভালোবাসাকে অপাত্রে বন্ধক রাখতে নেই। অপাত্রে রাখলে শুধু বিড়ম্বনাই ডেকে আনে।

গত বছর এক মহিলা মক্কেল এসে বলল, তার বাবা না থাকায় কম বয়সেই বিয়ে হয়। তার স্বামী বিয়ের কয়েক মাস পর অর্থ উপার্জনের জন্য বিদেশ যায়। তাই স্বামী বিদেশ যাবার সময় কিছু টাকা ভাইয়ের কাছ থেকে আর কিছু টাকা আত্মীয়র কাছ থেকে ধার করে দেয়। স্বামী প্রথম দিকে বলত, বিদেশের অবস্থা ভালো না। তার কিছু দিন পর তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।এই মহিলা পড়েন উভয় সংকটে। টাকার জন্য ভাই কিছু না বললেও আত্মীয় ক্রমেই চাপ দিতে থাকে। একসময় শ্বশুর বাড়ি থেকেও তাড়িয়ে দেয়। টাকা শোধ করার জন্য মহিলা বাধ্য হয়ে গার্মেন্টসে চাকরি করতে শুরু করে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি চাকরি করছেন। এর মধ্যে অনেক চেষ্টা করেও তার স্বামীর সাথে যোগাযোগ করতে পারে নি। কয়েক দিন আগে খবর পেয়েছেন যে দুই মাসের ছুটিতে দেশে এসে নতুন বিয়ে করেছেন। তিনি যোগাযোগ করলে তাকে প্রাণ নাশের হুমকি দেয়। সারাংশ এরকম যে তিনি প্রতারক স্বামীর সংসার করবেন না। তবে তিনি এই প্রতারণার বিচার চান। তিনি ভেবেছিলেনে আমার অনেক ক্ষমতা। আমি চাইলে কিছু করতে পারব। কিন্তু আমি কিছুই করতে পারিনি। গাজীপুর বারের এক বড় ভাইয়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম। অনেক দিন আগে ভারতে এক মেয়ের বয়ফ্রেন্ড তাকে ছেকা দেওয়া কলকাতা হাইকোর্টে সে ব্রিচ অব ট্রাস্টের মামলা ঠুকে দেয়। দীর্ঘ দিন পর সাক্ষী জেরা শেষে আদালত মেয়েকে কমপেনসেশন দেওয়ার জন্য বয়ফ্রেন্ডকে নির্দেশ দেন। নির্ধারিত তারিখে সে কমপেনসেশনের টাকা আদালতে জমাও দেয়। কিন্তু রায়ের পরে আর মেয়েটার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক খোঁজ নিয়ে জানা যায় মেয়েটা টাকার জন্য মামলা করেনি। মামলা করেছে বয়ফ্রেন্ডকে দোষী প্রমাণ করার জন্য। মামলা করেছে ন্যায়বিচারের জন্য যা সে পেয়েছে। বড় ভাই সব শুনে কোন ফি ছাড়াই সেই মামলা নিয়েছিলেন। নির্ধারিত তারিখে ওয়ারেন্ট বের হয়েছিল কিন্তু ওয়ারেন্ট থানায় পৌঁছানোর  আগেই বিদেশ পৌঁছে যায়। হয়তো মামলার কথা কোনোভাবে জানতে পেরেছিল। স্বামী বিদেশ চলে যাবার পর মহিলাও মামলা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কাজ রেখে একদিন আদালতে গেলে বেতন থেকে তিনশ’ টাকা কাটা যায়। তাছাড়া পাখি উড়ে গেলে খালি খাঁচা কেউ বয়ে বেড়াতে চায় না। আইনজীবী বড় ভাই কোন ফি ছাড়াই এতদিন সময় নিয়ে নিয়ে মামলাকে টেনে আনছিলেন। গত তারিখে আইনজীবী বড় ভাই বলেন, আদালতে আর সময় দিবে না। সবার সাথে কথা বলে বুঝে গিয়েছিলাম যে মামলাটি খারিজ হতে চলেছে। বিচারক ছুটিতে থাকার খারিজ হওয়ার হাত থেকে মামলাটি শেষবারের মতো বেঁচে যায়। এর মধ্যে করোনার আবির্ভাব। করোনার কারণে সেই  আসামী বাধ্য হয়ে দেশে আসে। আর এই সুযোগে পুলিশ তাকে ছো মেরে ধরে নিয়ে আসে। এখনো সেই  আসামী জেলেই আছে। এত মৃত্যুর মাঝেও অন্তত একটা সান্ত্বনা রয়ে গেল যে একটা মহিলা অন্তত ন্যায়বিচার পেতে যাচ্ছে। এদিকে বঙ্গবন্ধুর খুনি আব্দুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকরের ক্ষেত্রে করোনাই মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

লেখকঃ শরিফ খান

অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

div1 div2 div3 div4 div5 div6 div7 div8