মাত্র পাওয়া

সমকালেও নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা

| ২৭ আগস্ট ২০২১ | ৯:২০ অপরাহ্ণ

সমকালেও নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা

একটা সময় গোটা ভারতবর্ষে নজরুল, দিলীপ কুমার ও নেতাজি সু্বাস বোস, এই তিন প্রতিভা- মনীষা, বিপ্লবী যেভাবে মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করেছিলেন তাঁদের নিজ নিজ কর্ম গুণে, বোধ করি আজও তার আবেদন এতোটুকু কমেনি। বরং দিনকে দিন নানাভাবে তাঁরা ঘুরে ফিরে আসছেন আলোচনায়, চোখের সামনে তাঁদের প্রতিকৃতি যতোটা সমুজ্জ্বল, তারচে বেশি সমুজ্জ্বল ও শক্তিশালী এঁদের সৃষ্টি- আদর্শ। কী ক’রে বলি আমাদের সমাজ থেকে সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষ উৎপাটিত হয়েছে? কী ক’রে বলি বিপ্লব আর দ্রোহের বাঁশি আর বাজানোর দরকার নেই? কী করেই বা বলি প্রেমে- মানবতায় প্রণোদনা খুব বেশি জরুরী নয়? এসব ক্ষেত্রে নজরুল নিজেই আশ্চর্য বিষের বাঁশি, পরাক্রমশালী অগ্নিবীণা।
সাম্প্রদায়িকতার নামে হিন্দু-মুসলমান বা অন্য সম্প্রদায়ের মধ্যে যে অদৃশ্য বিভেদের দেয়াল তা ভেঙ্গে দিয়ে রক্তের নাব্যতায় শান্তি ও মানবতার শীতল ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হতে আমি নজরুলের কবিতা, গীতিকবিতা, ভাষ্য ও গদ্যের তো খুব বেশি বিকল্প পাইনা। প্রেম ভজনা, প্রার্থনা, নিমগ্নতা, দ্রোহ- বিপ্লব- মানুষ হিশেবে মানুষের বেঁচে থাকা- সাম্যবাদের বীজতলা- ফসল, মানবতাবাদের মন্ত্র- জাগরণের গান; এমনকি একদিকে বিপ্লবের ডাক, অন্যদিকে মানবতাবাদ ও প্রেমের জায়নামাজ দু’ ধারাতেই ফিরে যেতে হবে আমাদেরকে নজরুলের কাছে।
আজও যখন ধর্মের নামে চাপাতি দিয়ে রক্তের হুলি খেলা চলে, আজও যখন বিশ্ববীক্ষণে সমান ক্রিয়াশীল দেখি ধর্মের নামে মানুষ নিধন, আজও যখন রেল স্টেশনে-বস্তিতে- ফুটপাতে কাঁদে মানবতা- আজও যখন মসজিদ মন্দির- গির্জার মতো মহৎ ও শুদ্ধতম জায়গা গুলোতে নিজের ও কওমের স্বার্থ জারি রাখার জন্য এখানে বসেই অধর্মের চর্চা দেখি , এমনকি ভুল দর্শন ও তত্ত্ব চাপিয়ে দিয়ে সভ্যতা- সমাজ- মানবতা ও রাষ্ট্রকে করে তুলতে দেখি বিপন্ন- রক্তাক্ত; আজও যখন হত্যা করা হয় রাজন, সিনহা ও রাকিবের মতো গোলাপের কলি, আজও যখন সমান ক্রিয়াশীল বাবুদের কূটচাল- নৈরাজ্য- দখল- লুটপাট তখন কাকে আর এতো বেশি মনে পড়ে এক নজরুল ছাড়া? এমনকি আমরা যখন বারুদের স্তুপের ওপর বসে জীবন বাজি ধরি দেশমাতার সম্ভ্রম রক্ষায়, স্বদেশের আকাশে দেখি কালোমেঘ, তখনো কিন্তু চাঁপা বেলি জুঁই চামেলি ও গোলাপের গন্ধ নিয়ে দম ধরে রাখার জন্য হিমালয়ের মতো অটুট ও ইস্পাতের মতো কঠিন থাকার মূল মন্ত্রের জন্য ফিরে যেতে হয় নজরুলের কাছে, তাঁর কবিতা- সংগীতের কাছে। এখানেই নজরুল অনন্য। অসামান্য নজরুল তখনও যখন আমরা নজরুল থেকে দীক্ষা পাই হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান বৌদ্ধ ইত্যাদি ছাপিয়ে আমাদের বড় পরিচয় আমরা মানুষ, যে মানুষের নিয়তি ও গন্তব্য সাম্য ও মানবতা। পশ্চিমা দুনিয়া যে কারণে এখন ঝুকছে রুমির দিকে ঠিক একই কারণে পাশ্চ্য ও পাশ্চাত্য তথা গোটা দুনিয়ায় নজরুল সমধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠছেন ও ওঠবেন যদি আমরা তাঁকে যথাযথ ভাবে উপস্থাপন করতে পারি।
ফিলিস্তিনি কিংবা আফগানের আকাশে ধর্মান্ধ ঈগল অশনিসংকেত দিয়ে যখন ডানা ঝাপটাচ্ছে তখনও আমাদেরকে সহনশীলতা ও মানবীয়বোধের বিশ্ববীক্ষণ দর্শনের অমোঘ উচ্চারণের জন্য এবং ঘুটঘুটে অন্ধকারে একচিলতে আলোর খোঁজে সমবেত হতে হচ্ছে নজরুল নামের বিপুল বিস্ময়কর মহান কবির বোধের আঙিনায়। এমনকি আমার ছাপান্নো হাজার বর্গমাইল ব্যেপে যখন হাটহাজারি কিংবা চরমোনাইর প্রান্তর থেকে ছুটে আসা ঝড়োবাতাস বইতে শুরু করে তখনও শান্তি, সংহতি ও মানবতার উদারনৈতিক নির্ভুল বার্তার জন্য, এবং ঝড়োবাতাসের গতিরোধের জন্য আমাদেরকে যে শক্তিশালী রক্ষাবর্মের আশ্রয় নিতে হয় তার জন্যও দ্বারস্থ হতে হয় নজরুলের কবিতা,প্রবন্ধ,ভাষ্য,নিবন্ধ ও গীতিকবিতার কাছে। এক্ষেত্রে নজরুলের বিকল্প তো নেইও এ উপমহাদেশে।
নজরুল ১২ ই ভাদ্র, ২৯ আগস্ট, ১৯৭৬ খ্রি. দেহ ত্যাগ করেছেন এটা আমার কাছে বেদনার বিষয় নয়, যতোটা বেদনার বিষয় হৃদয়ে শেল সম হয়ে লাগে তা হলো মৃত্যুর তেত্রিশ বছর আগে তাঁর প্রকৃত মৃত্যুর ব্যাপারটি। যতোকাল তিনি স্তব্দ ছিলেন, ছিলেন পৃথিবী মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের ভেতর ডুবে থাকা অভিমানী ধ্যানী-ঋষি, সে সময় গুলোই মূলত সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য পরিণত সময়, সোনালি সময়। মূল ধীশক্তি প্রকাশের আগেই প্রকৃত বীরকে ঘুমানো মানায় না। এটা নজরুল বুঝলেও সময় প্রকৃতি ও মানুষ বোঝে ওঠতে পারেননি। এখানেই সাময়িক ভাবে বিপুল জয়ী হয়েছে ঔপনিবেশিক শক্তি, জয়ী হয়েছে ধর্মান্ধ ঈগলেরা, জয়ী হয়েছিলো মানবতা লুণ্ঠনকারী বণিকেরা। আনন্দের বিষয় হচ্ছে, স্থায়ী জয় তাদের আসেনি। নজরুলের সৃষ্টি তাদেরকে জয়ী হতে দেয়নি। এখন আমাদের সময় হয়েছে অবশিষ্ট প্রতিক্রিয়াশীলশক্তি ও মানবতার শত্রুগুলোকে চিহ্নিত করা, প্রতিহত করা। এক্ষেত্রেও সমান তালে আগের চেয়েও শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী হয়ে সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষ উৎপাটন, মানবতা, অধিকার সংরক্ষণ ও স্বাধীনতা রক্ষায় নজরুল আমাদের অগ্রণী সেনাপতি হয়ে নেতৃত্ব দেবেন। তবেই সমূলে উৎপাটিত হবে ধর্মীয় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সকল অনৈতিক শক্তি, সকল দাঁতাল শুয়োর ও ঈগলেরা। এ বিপ্লবে আমাদের প্রাণের সঞ্জীবনী শক্তি ও সংগীত হবে-
মহা- বিদ্রোহী রণক্লান্ত/আমি সেই দিন হব শান্ত।/যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,/অত্যাচারীর খড়ুগ কৃপাণ ভীম রণ, ভূমে রণিবে না-বিদ্রোহী রণক্লান্ত/আমি সেই দিন হব শান্ত।/আমি চির বিদ্রোহী বীর –/ বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির !
লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ছোটগল্প : না

২৪ মে ২০২০

Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

div1 div2 div3 div4 div5 div6 div7 div8
  • Our Visitor

    0 0 2 1 2 0
    Users Today : 6
    Users Yesterday : 7
    Users Last 7 days : 56
    Users Last 30 days : 475
    Users This Month : 13
    Users This Year : 2119
    Total Users : 2120
    Views Today : 7
    Views Yesterday : 44
    Views Last 7 days : 189
    Views Last 30 days : 949
    Views This Month : 51
    Views This Year : 3132
    Total views : 3133
    Who's Online : 0
    Your IP Address : 52.23.219.12
    Server Time : 2021-12-02